মধ্যবিত্ত /নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে সন্তানের অন্যায় আবদার পূরণ করতে গিয়ে নাজেহাল অবস্থা l

সোমা দাস

 

সামাজিক অবক্ষয় 

সোমা দাস 


পারিবারিক শিক্ষার উপর নির্ভর করে একটি শিশুর আগামী ভবিষ্যৎ l শিশু র মানসিক বিকাশ কে সুদৃঢ় করতে পিতামাতা সহ পরিবারের সদস্য দের সু -শিক্ষা, আচরণ বিধি --এককথায় সব কিছু নিয়ে l এর মধ্যে মায়ের ভূমিকা সবার আগে l কারণ দিনের বেশিরভাগ সময় ই একজন সন্তান এর কাছাকাছি থাকেন l একজন সুস্থ মানসিকতার মা ই পারেন সুস্থ ও সুন্দর মনের সন্তান তৈরী করতে l মায়ের পুঁথিগত শিক্ষার থেকে অতি জরুরী মায়ের নিজের দেওয়া শিক্ষা l যেমন -বড়োদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয়, জ্ঞানী গুণী মানুষদের জীবনী সন্তান দের সাথে আলোচনা করা, সন্তানকে  মুঠোয় বন্দী না করে মুক্ত ভাবে প্রকৃতির কোলে ছেড়ে দেওয়া l

আমরা ব্যস্ত থাকি সন্তান কে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার তৈরী তে l পিঠে একগাদা বই এর বোঝা তুলে দিয়ে নামি ধামি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়াতে পারলে তবেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি l বাংলা মিডিয়াম?? সে তো ব্যাক ডেটেড l দু কলি ইংরেজি লাইন সন্তানের মুখে শুনতে পেলে গর্বে বুকটা ভরে উঠে l অথচ বাংলা তে নিজের নাম লিখতে পারছেনা দেখে আপসোস নয়, গর্ব করেন একাংশ অভিভাবক রা l মধ্যবিত্ত /নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে সন্তানের অন্যায় আবদার পূরণ করতে গিয়ে নাজেহাল অবস্থা l

এখন তো আবার ডিজিটাল এর যুগ l মোবাইল হাতে টিউশন করতে যাচ্ছে প্রাইমারি লেভেলের পড়ুয়ারা l কেন বলুন তো? এটা দেওয়াটা কি খুব জরুরী ছিলো? পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনার জন্যে এক তরফা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা /আইনের দোহাই দিয়ে নিজেদের ত্রুটি গুলো আড়াল করছি না তো? ভেবে দেখুন, আপনি, আপনার বাবা, মা, কাকারা যখন মাস্টার মশাই এর বাড়ি পড়তে যেতেন তখন এসব স্মার্ট ফোন ছিলো? তবে কি তাঁরা বাড়ি ফিরে আসতেন না? নাকি লেখাপড়া কামাই করে গাছে চড়ে বসতেন?

প্রতিদিন সংবাদ শিরোনামে উঠে আসছে খুন, ধর্ষণ এর মতো অনভিপ্রেত ঘটনা l এসবের জন্যে কি শুধুমাত্র প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা কে দায়ী করা যায়? বারো বছরের শিশু পালিয়ে যাচ্ছে অচেনা অজানা কারোর হাত ধরে, সংসার করবে বলে l ওকে যদি "সংসার "-শব্দ টা লিখতে দেওয়া হয় তা ঠিকঠাক ভাবে লিখতে পারবে কিনা সন্দেহ আছে l একরত্তি এইসব ছেলে মেয়েটা, "প্রেম "-"ভালোবাসা "-কাকে বলে বুঝে? ধরে নিলাম যদি বুঝেই থাকে তাহলে ছেলেটির সাথে যোগাযোগ বা আলাপ কি করে হলো? ঠিক বলেছেন আপনার কিনে দেওয়া মোবাইল এর মাধ্যমে এসব ঘটেছে l তারপর যা হবার হলো l থানা, পুলিশ, কোর্ট কাছারি l তারপর ঘাড় ধাক্কা ইত্যাদি ইত্যাদি l পুলিশ যখন আপনাকে থানায় ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলো তখন আপনি বললেন, আপনি কিছুই জানেন না l কে জানবে? পাশের বাড়ির কেউ?

মোবাইল এর জন্যে আত্মহত্যা, পরীক্ষায় নম্বর কম পাওয়ার ফলে দু চারটি গালমন্দ করায় ঝুলে পড়লো সিলিং এ, ত্রিকোণ প্রেমের জেরে আত্মহত্যা --এসব এখন জলভাত l

এইসব সামাজিক অবক্ষয় এর জন্যে আমরা যাঁরা অভিভাবক আছি, আমাদের কি কোনো দায় নেই?

ভেবে দেখুন তো যেদিন আপনার সন্তান আপনার কাছে একটি দামী মোবাইল চেয়েছিল সেদিন আপনি কি বলেছিলেন বা কি করেছিলেন l চোখ রাঙিয়ে অথবা গালে ঠাসিয়ে চড় কষিয়ে বলেছিলেন, "আমি দিতে পারবো না তোমার যা ইচ্ছে তাই করতে পারো "-এই ধরণের ছেলে মরে গেলেই ভালো,, ইত্যাদি ইত্যাদি l একবারও সন্তান কে বলার চেষ্টা করেন নি, পাশের বাড়ির ছেলেটা প্রায় ই না খেয়ে স্কুলে যায়, অথচ খুব মেধাবী,তার ভালো একটা জামা নেই, ওর কথাটা একবার ভেবে দেখো, আপনি বলেননি ডক্টর এ পি জি আব্দুল কালাম, জীবনানন্দ, বিদ্যাসাগর, শরৎ চন্দ্রের মত গুণী জনার লড়াই সংগ্রাম এর কথা l খোঁজ রাখেন নি সন্তানের মনের খবর l কি চলছে ওর মনে, বুঝতে চান নি ওর চাওয়া পাওয়ার সমীকরণ l মূল্য দেননি আবেগ অনুভূতির l আপনার কথার মূল্য যাতে সে দেয় এটাই সর্বদা চেষ্টা করে গেছেন l মনোবিদ দের ভাষায়, শিশুকে তার মত করে বারো বছর পর্যন্ত প্রকৃতির কোলে ছেড়ে দেওয়া, আপনি শুধু গাইড করবেন, যাতে কোনো বিপদ না হয় l

অনেকেই হয়তো মন ক্ষুন্ন হবেন, ভাবছেন জ্ঞান দিচ্ছি l

ক্ষমা করবেন! জ্ঞান দেওয়ার মতো যোগ্য হয়ে উঠিনি l নিজ কর্তব্য পালন করতে গিয়ে এক ঘটনার সাক্ষী হয়ে, এসব বলতে বাধ্য হয়েছি l বিস্তারিত বলা ঠিক হবে না l দু এক লাইনে শেষ করছি l পঞ্চম শ্রেণীর এক ছাত্রী ভর দুপুরে টিউশন  যাবার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে টিউশন না গিয়ে একই গ্রামের ষষ্ঠ শ্রেণীর এক ছাত্রের সাথে নির্জন জায়গায় গল্পে মশগুল l হাতে ব্রেন্ডেড মোবাইল l এরা এতটাই মগ্ন ছিলো যে, ভুলে গেছিলো পাশের রাস্তা দিয়ে কেউ যেতে পারে অথবা ওদের ফিস ফিসানি কেউ শুনতে পারে l দৈবাৎ ক্রমে সেখানে উপস্থিত হইয়া যাহা প্রত্যক্ষ করিলাম তাহাতে আমার চক্ষু স্থির l

যাই হোক, পরবর্তীতে যা করণীয় করলাম l মর্মাহত হলাম বিষয় টি নিয়ে ভাবতে l


এই পৃথিবীর প্রত্যেক বাবা মায়ের প্রতি আমার শত কোটি প্রণাম, শ্রদ্ধা নিবেদন করছি l কিন্তু এহেন অনভিপ্রেত বিষয় থেকে সন্তান দের বিরত থাকতে আপনাদের সু চিন্তিত পদক্ষেপ, আদেশ প্রার্থনা করছি l বিনম্র অনুরোধ রাখছি --, এ সমাজ টাকে বাঁচান, এ পৃথিবীর প্রতিটি সন্তান আপনার --এই ভেবে এগিয়ে আসুন, আপনাদের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠুক আগামীর ভবিষ্যৎ l