ঐ বন্ধন না থাকলে আমরা হয়তো ক্ষণিকের জন্য কিছুটা উপরে উঠে যেতে পারি,

 

শংকর ব্রহ্ম

সফলতা 

শংকর ব্রহ্ম

            অবনীবাবু ইদানিং লক্ষ্য করে দেখেছেন, তার ছেলে অমল কী কারণে যেন সব সময় মন মরা হয়ে থাকে।

           একদিন অবনীবাবু তার কাছে জানতে চাইলেন, কিরে অমল,  এতো কি ভাবিস তুই? আমায় বলতো।

অমল তার বাবার কাছে জানতে চাইল ,

আচ্ছা বাবা,  জীবনে সফলতা বলতে তুমি কি বোঝ? সফলতা কাকে বলে বাবা , তুমি জান? বলতে পারবে আমাকে?

বাবা তার কথার কোন উত্তর না দিয়ে বললেন ,

- চল তোর সাথে আজ ছাদে গিয়ে ঘুড়ি উড়াবো একসঙ্গে।

অমল কিছুটা হতবাক হয়ে পড়ে বাবার এই কথা শুনে , তবু বাবার সঙ্গে ছাদে যায় দ্বিধাভরে।

ছাদে এসে বাবা, অমলের হাতে লাটাই ধরিয়ে দিয়ে, নিজে ঘুড়ি ওড়ানো শুরু করলেন।  ঘুড়ি আকাশের বেশ কিছুটা উপরে উঠে যাবার পর বাবা বললেন , এই দেখ ঘুড়িটা অতো উচুতেও কেমন বাতাসে ভেসে আছে। তোর  কি মনে হয় না, এই সূতোর টানের কারণে ঘুড়িটা আরও উপরে উঠে যেতে পারছে না ?

- তা ঠিক, সূতোতে বাধা  না থাকলে ঘুড়িটা আরও উপরে উঠে যেতে পারত।

অমল বাবার কথার উত্তরে বলল, হ্যাঁ তো।

বাবা বললেন, বেশ।

তারপর আলগোছে সূতোটা ছিঁড়ে দিলেন। 

ঘুড়িটা সূতোর টান মুক্ত হয়েই প্রথমে কিছুটা উপরে উঠে গেল। কিন্তু তারপরেই নীচের দিকে নামতে নামতে, একসময় কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।

           অমল তা দেখে আরও হতবাক হয়ে গেল।

এরপর অবনীবাবু অমলকে ডেকে বললেন ,

শোন জীবনে আমরা যে উচ্চতায় আছি বা থাকি সেখান থেকে প্রায়ই মনে হয় , ঘুড়ির সূতোর মত কিছু কিছু বন্ধন আমাদের আরও উপরে উঠে যেতে বাধা দেয়। যেমন - ধর

পারিবারিক বন্ধন , সামাজিক অনুশাসন , আত্মসন্মান বোধ , দায়িত্ব , কর্তব্য ইত্যাদি ইত্যাদি, 

আর আমরাও সেইসব বাঁধন থেকে কখনও কখনও মুক্ত হতে চাই। চাই কি না বল?

অমল সন্মতিসূচক মাথা নাড়িয় জানাল ,হ্যাঁ ।

তাই দেখে বাবা আবার বলতে শুরু করেন,

বাস্তবে ঐ বন্ধনগুলোই আমাদের উঁচুতে টিকিয়ে রাখে, স্থির রাখে, নীচে পড়ে যেতে দেয় না। 

ঐ বন্ধন না থাকলে আমরা হয়তো ক্ষণিকের জন্য কিছুটা উপরে উঠে যেতে পারি, কিন্তু অল্পসময় পরেই আমাদেরও অনিবার্য পতন হতে হতে বাধ্য ওই সূতো ছেঁড়া ঘুড়িটার মতোই |


          জীবনে তুই যদি উঁচুতে টিকে থাকতে চাস  তবে কখনওই ঐ বন্ধন ছিঁড়িবি  না। সূতা আর ঘুড়ির মিলিত বন্ধন যেমন আকাশে ঘুড়িকে দেয় ভারসাম্য , তেমনি সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনও আমাদের জীবনের উচ্চতায় টিঁকে থাকার জন্য ভারসাম্য বজায় রাখে।

আর এটাই হল জীবনের প্রকৃত সফলতার লক্ষণ। বোঝা গেল?

            অমল বিমূঢ় বিস্ময়ে বাবার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল অবাক হয়ে।