যে সূর্যাস্ত কোনোদিন বারান্দা থেকে দেখা হয়নি, গঙ্গার ঘাটে,পাহাড়ের চূড়াতেও না, তাকে সমূহ প্রত্যক্ষ করলো অনুশীলা এই পবিত্র সন্ধ্যায়।
গৈরিক সূর্যাস্ত
গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়
মেয়েটা স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে আদাড়ে-বাদাড়ে ঘোরে। শুধু স্বভাবসিদ্ধ স্বপ্ন নিয়ে একটা জীবনের হিসাব-নিকাশ। কখনও জঙ্গলের ভেতর, নয়তো সমুদ্রের কিনারে। ভালোবাসার মানুষের বড়ই অভাব। ভিক্ষাপাত্র খালি, আধুলি-দুআনা। এই কি জীবন।
অনুশীলার প্রত্যাশিত এ জীবন নয় আকাঙ্খিত। সমুদ্র সৈকতে সফেদ সমুদ্র সফেন, হয়তো ইহাদের মতো জীবন, সমুদ্র তীরে এইসব ছড়ানো ছেটানো নুড়ির মতন। সমুদ্র সৈকতে বসে একলা অনুশীলা।
নদী সমুদ্রে মেশে, দিন ও রাত্রির সাথেই মেশে সন্ধ্যার গৈরিক আকাশে। জীবন ও মেশে মৃত্যুর অরব অন্ধকারে নীল অভিমানে। তাজপুর সমুদ্র সৈকতে লাল কাঁকড়ার তড়িৎ আনাগোনার ছবি তুলতে তুলতে এইসব আচমকাই আসছিল ভাবনায়। দোষের মধ্যে দোষ মেয়েটা স্বভাববোধে একলা, বোহেমিয়ান কথাটাই একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে।
আগে ছোটবেলার কথা মনে পড়লে ভাবে কত বন্ধু সই ছিল তার, রোজ খুনসুটি, পাগলামি, কতোদিন কত মজা, হাসি তামাশা লেগেই ছিল। তারপর কলকাতার কাছাকাছি চলে এল সবাই, অনুশীলা এক মেডিকেল কলেজের হোস্টেল এ। ক্রমশ সঙ্কোচ এল এই নতুন জীবনে। স্বাভাবিক ভাবেই একটু একটু করে প্রগলভ অনুশীলা অন্তরীণ হলো। এ যেন সেই হঠাৎই বাবাকে জাপটে ধরা অনুশীলা নয়। বাবা অনু কে খুব ভালোবাসে,বলতে গেলে চোখে হারান। বাড়ি গেলে পাগলি মা অনুর তদারকি তে শশব্যস্ত। ভীষণ গর্ব হয় মেয়ের জন্য। অনুচ্চারিত মন খারাপ হয়ে থাকে অনুর হোস্টেল এর দিনগুলোয়। একটা সেমিস্টার শেষ হলো। এখন একটু স্বাচ্ছন্দ্য। সপ্তর্ষি ওর এক সিনিয়র দাদা, ক্যান্টিন এ বসে নিছকই আলাপ। অনু জানে সতুদা(সপ্তর্ষি) খুব ভালো পড়াশোনায়। প্রায় সবকটা সাবজেক্ট এই অনার্স মার্ক। কয়েকটাই ইউনিভার্সিটির টপার। ভালো টেবিল টেনিস প্লেয়ার। একটা আনুগত্য তৈরি হয় অনুর মনে। তাই আজকাল প্রায় নিয়মিত সতুদার সাথে,পড়াশোনা,এবং বিভিন্ন ব্যাপারে আলোচনা করে,বেশিরভাগ টা ক্যান্টিন এই। এই আনুগত্য কখন চুপিসাড়ে হৃদয়ে কোমল আঁচড় টেনে দিচ্ছে,এটা অনু ঠিক তেমন ভাবেই বুঝেই উঠতে পারেনি। যখন সতুদা কলেজ ছেড়ে জয়পুরে এম,এস,অর্থোপেডিক্স করতে গেল, তখনও এক বুকভরা উচ্ছ্বাস। তারপর আবার ক্রমশ শুরু হলো একাকীত্ব। মনে হল কোথাও কিছু যেন কম পড়েছে। সামনে ফাইনাল পরীক্ষা। বেশি উতলা না হয়ে,অনু স্বাভাবিক ছন্দে আর পাঁচটা ছেলে মেয়ের মতো ভালোভাবেই পাশ করলো, তারপর এই মাইক্রোবায়োলজি। এম,ডি, পাশ। গবেষণার কাজ শেষ। বেশ কিছুদিন শূন্য।
তাজপুর সমুদ্র সৈকত এখনও ঠিক তেমনই আছে, যেমন ছিল পাঁচ-বছর আগে। কলেজের বন্ধুদের সাথে এসেছিল সেবার। এবার একা। সমুদ্র কে সব কথা বলতে। ভালোবাসতে পেরেছিল অনু,শুধুমাত্র মুখ ফুটে বলতে পারেনি মনের কথা। বিকেলের সমুদ্র সরে গেছে অনেক নীচে। ভিজে বালুচর, নরম আদুরে বুকে একটা গাছের ভাঙ্গা ডাল দিয়ে লেখে "অনুশীলা", ছোট ঢেউ এসে মুছে দেয় রেখা। আবারও লেখে, আবারও মুছে দেয় ঢেউ। হঠাৎই লেখে,"সপ্তর্ষি", মুছে সাফ করে দেয় একটা প্রকান্ড ঢেউ। দূরে সরে আসে অনু। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। কতবার পাহাড়ে গেছে, কতবার গ্রামের মোরাম রাস্তায় চলে গেছে বহুপথ, আসন্ন সন্ধ্যার এই রঙের খোঁজে। গোধূলির গৈরিক রঙের বাহার। যেন মনে হয় সমস্ত অভিমুখ পুরুষের সেই পরম ব্রহ্ম আদি অকৃত্রিম সন্ধ্যার এই যুগ-সন্ধিক্ষনে যার প্রকাশ প্রকান্ড ব্রহ্মান্ডে আকাশে আকাশে প্রজ্জ্বলিত গৈরিক বেশ।
অনুশীলার মনের সমস্ত গ্লানি মুছে যায়, একবার আকাশ আর একবার দূর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে। আহা কি বৈভব, আকাশের গৈরিক প্রকাশিত অন্তিম সমুদ্র জলরাশির বুকে।
এই তো জীবন। এই তো মরণ।
যে সূর্যাস্ত কোনোদিন বারান্দা থেকে দেখা হয়নি, গঙ্গার ঘাটে,পাহাড়ের চূড়াতেও না, তাকে সমূহ প্রত্যক্ষ করলো অনুশীলা এই পবিত্র সন্ধ্যায়।
- গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়। ০৫,০৩,২০২২
Post a Comment