মেয়ে মহলে তার প্রসঙ্গে উঠলে, বদ্বুদের মতো উঠেই আবার হঠাৎ মিলিয়ে যেত। কারণ কেউ তার সম্পর্কে বেশী কিছু জানত না, ফলে বলতে পারত না।
পাথরের চোখ
শংকর ব্রহ্ম
আমাদের দপ্তরেই লোকটা চাকরী করত।
মাস কয়েক আগে জয়েন করেছে এখানে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, কারও সঙ্গে মিশত না সে , কথাও বলত না খুব একটা। কারও কোন ব্যাপারেই সে সাথে পাছে থাকত না। একা একা ক্যান্টিনে গিয়ে টিফিন করত। তার সম্পর্কে মেয়েদের কৌতূহলের শেষ ছিল না।
অফিসে আমরা পরস্পর, পরস্পরের সঙ্গে কত কথা বলতাম, রাজনীতি নিয়ে ,খেলা নিয়ে , সিনেমা নিয়ে , বইমেলা নিয়ে আলোচনা করতাম। সে থাকত নীরব। কোন ব্যাপারে যেন তার কোন কৌতূহল ছিল না। সে কখনও কোন মতামত প্রকাশ করত না, আমাদের আলোচনায়।
যতবার আমি তার চোখের দিকে তাকিয়েছি, দেখছি যেন পাথের এক-জোড়া চোখ, ভাষাহীন।
মেয়ে মহলে তার প্রসঙ্গে উঠলে, বদ্বুদের মতো উঠেই আবার হঠাৎ মিলিয়ে যেত। কারণ কেউ তার সম্পর্কে বেশী কিছু জানত না, ফলে বলতে পারত না।
কখনও সখনও সে আমার হাতের বই বা পত্রিকা চেয়ে নিয়ে পড়ত। কিন্ত তার সম্পর্কেও কখনও কোন মন্তব্য প্রকাশ করত না।
তাকে দেখে আমার মনে হত, গোবেচারা স্বভাবের ভাবলেশহীন মানুষ একজন সে। যার আমাদের কারও সম্পর্কে কোন কৌতূহল নেই, বিস্ময় নেই । আশ্চর্য মানুষই বটে একজন।
পুরনো অফিস ক্যান্টিন ভেঙে আবার নতুন করে গড়া হচ্ছে। ফলে, অনেকেই নিজের টেবিলে চা আনিয়ে খাচ্ছে। কেউ কেউ আবার ভাঙা ক্যান্টিনের আসে পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছে। লোকটিও একপাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিল দেখলাম। কিছু দূরে দাড়িয়ে আমি, একটা চায়ের অর্ডার দিয়ে, হাতের পত্রিকাটা খুলে দেখছি। চা খেতে খেতে সে ওই পত্রিকাটি একবার আমার কাছে দেখতে চাইল । দিলাম তাকে। হাতে নিয়ে সে নব-বিবাহিতদের পাতায় একটি ছবি দেখে, তার হাত থেকে চায়ের কাপটি পড়ে গেল। হঠাৎ সেও ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেল দেখলাম। আমরা কয়েকজনে হৈ চৈ করে ছুটে গেলাম। তাকে তুলে এনে অফিসের পাখার নীচে শোয়ালাম। তারপর চোখে জলের ঝাপটা দিতে, কিছুক্ষণ পরে তার জ্ঞান ফিরে এলো। সে উঠে বসলো। আমরা তাকে বললাম,আপনার শরীর ভাল নেই, আপনি বাড়ি চলে যান আজ।
- ঐ পত্রিকাটি একটু নিতে পারি?
- হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিন না। বললাম আমি।
- ওর থেকে একটা ছবি কেটে নেবো?
- দরকার হলে, নিশ্চয়ই কেটে নেবেন।
পত্রিকটাই নিয়ে না হয় আপনি আজ বাড়ি চলে যান ।
- বেশ। বলে সে পত্রিকাটি নিয়ে সেদিন বাড়ি চলে গেল।
পরের দিন সে আর অফিসে আসেনি। তারপর দিনও না। মাসখানেক পরে শুনলাম, তিনি চাকরী ছেড়ে দিয়েছেন।
তার কথা প্রায় ভুলেই গেছিলাম। জীবনে কত লোকের সঙ্গে আলাপ,পরিচয়, হৃদ্যতা হয়, কিন্তু ক'জনের কথাই বা মনে থাকে বলুন?
কয়েকমাস পর পোষ্ট অফিস থেকে একটি চিঠি আসায়, তার কথা আবার মনে পড়ল।
তিনি লিখেছেন, আপনার কাছ থেকে যে পত্রিকাটা নিয়ে গিয়েছিলাম, তাতে আমার প্রাক্তন স্ত্রীর ছবি ছিল। ছবিতে তাকে অপূর্ব দেখাচ্ছে। কিন্তু আমি জানি, ছবিতে তার সৌন্দর্য ঠিক সম্পূর্ণ তুলে ধরে যায় না। যার চোখে কবিতার ভাষা আছে সে বুঝবে , ক্যামেরার চোখে তো আর সে ভাষা নেই।
আর তার এই সৌন্দর্যই শেষ পর্যন্ত কাল হলো।
প্রতিবেশী এক তরুণ কবি তার রূপে মুগ্ধ হয়ে,
আস্ত একখানা প্রেম-কাব্য উপখ্যান লিখে ফেললো। সেটা আবার টাকা খরচ করে ছাপিয়ে তাকে উৎসর্গ করলো।
আশ্চর্য, সেও সেই তরুণ কবির প্রেমে পড়ে হাবুডুবু খেতে লাগল। পাগল হয়ে উঠল যেন সে। কিছুদিন আমি তা লক্ষ্য করে বুঝতে পেরে, প্রথমে খুব কষ্ট পেলাম মনে।
পরে ভাবলাম যে আমাকে ভালবাসে না তাকে ভুলে থাকাই ভাল। তাই আমি তাকে মিউচুয়ালি ডিভোর্স দিলাম।
গত মাসের সাতাশ তারিখে তার আবার নতুন বিয়ে হয়েছে ওই তরুণ কবির সাথে । তারই ছবি প্রকাশিত হয়েছিল ওই পত্রিকায়।
চিঠিটা পড়ে আমার চোখে, তার ভাবলেশহীন পাথরের চোখ দু'টো ভেসে উঠলো। চোখ দুটো থেকে দু'ফোঁটা জল যেন গড়িয়ে পড়ল আমার হাতে মনে হলো। না হলে হাতটা আমার এখন ভেজা কেন? আমি তো আর কাঁদিনি, তার দুঃখে অশ্রুসিক্ত হয়ে।
----------------------------------------------------------
Post a Comment