ছাত্রীদের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি সর্বোপরি মূল্যবোধের অভাব প্রকট হয়ে পড়েছে. সমাজ জীবনে তার দীর্ঘ ছায়া লক্ষ করা যাচ্ছে.
স্মরণ
-----------
বিস্মৃত কবি যতীন্দ্র মোহন বাগচী
---------------------------------------
জন্ম :27 নভেম্বর, 1878 (নদীয়া )
মৃত্যু :1 ফেব্রুয়ারী, 1948
পিতা :হরি মোহন বাগচী
মাতা :গিরিশ মোহিনী দেবী
-------------------------------------
অমিতাভ মুখোপাধ্যায়
'বাঁশ বাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই
মাগো আমার শোলক বলা কাজলা দিদি কই-------'
মনে পড়ছে হারিয়ে যাওয়া সেই বিখ্যাত 'কাজলা দিদির' কথা? বিশিষ্ট সংগীত শিল্পী প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় যাকে অমরত্ব দিয়ে গেছেন. কিংবা
'ওই যে গাঁটি যাচ্ছে দেখা আইরি খেতের আড়ে
প্রান্তটি যার আঁধার করা সবুজ কেয়া ঝাড়ে ----'জন্মভূমি'কবিতাটির কথা? আজ যাঁদের বয়স প্রায় ষাট উর্ধ তাঁদের স্মৃতি নাড়া দিলে মনে পড়তে পারে সেই সময়ের পঞ্চম -অষ্টম শ্রেণীতে পড়া বিশেষ করে এই কবিতা দুটির কথা. মাঝে পড়ানো হয়েছিল কিনা মনে নেই. এই সঙ্গে মনে পড়ছে, স্ব স্ব বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল কবি কালিদাস রায়, মোহিত লাল মজুমদার, সত্যেন্দ্র নাথ দত্ত তৎসহ আর এক গ্রাম বাংলার কবি যতীন্দ্র নাথ সেনগুপ্ত সর্বোপরি মহিলা কবি কামিনী রায় -এর কথা.
কবি যতীন্দ্র মোহন বাগচী শুধু পল্লী প্রকৃতির কবি ছিলেন না. তিনি একজন সাংবাদিকও ছিলেন. সম্পাদক হিসেবেও সুপরিচিত ছিলেন. তাঁর উল্লেখ যোগ্য কাব্য গ্রন্থের নাম -লেখা (1906), রেখা (1910), অপরাজিতা (1915), নীহারিকা (1927), মহাভারতী (1936)ইত্যাদি. সম্পাদিত পত্রিকার নাম -মানসী (1909-13), যুগ্ম সম্পাদনা -যমুনা (1921-22), পূর্বাচল (1947-48).আরও বিভিন্ন ধরনের লেখা তিনি লিখে ছেন. 'পথের সাথী 'নামে একটি উপন্যাসও লিখে ছিলেন. তবে রবীন্দ্র পরবর্তী যুগের একজন প্রতিভাধর পল্লী কবি হিসেবেই তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন. কাব্য সমালোচকদের মতে, তিনি মূলতঃ রবীন্দ্র অনুরাগী কবি. ভিন্ন মত পোষণ করে অনেকে বলেছেন, তিনি রবীন্দ্র অনুগামী হলেও এক স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন. বিশেষ করে তিনি নিসর্গ প্রকৃতির কবি. জীবনানন্দ -এর মতো তাঁর কবিতাও চিত্ররূপও ময়. যাই হোক, সেই সময় রবীন্দ্রপ্রতিভা বা তাঁর সৃষ্টির বিশাল সম্ভারকে অস্বীকার বা অতিক্রম করার ক্ষমতা কারও ছিল না -বর্তমানেও নেই. 'কল্লোল' যুগের ইতিহাস যাঁদের জানা আছে -তাঁরা একবাক্যে এই ধ্রুব সত্যটি স্বীকার করে নেবেন.
শেষে বলি, কোন প্রকৃত প্রতিভার মৃত্যু নেই. সাময়িক ভাবে তিনি চর্চার বাইরে চলে গেলেও সময়ের আলোকে কোন না কোন দিন আবার আলোকিত হবেনই. আমাদের সারস্বত চর্চায় রবীন্দ্র, নজরুল প্রতিভার আকাশ জোড়া ব্যাপ্তির মাঝে এক একজন বিচ্ছিন্ন তারার মতো এই সব সাহিত্য প্রতিভা রাও আলোচ্য বিষয় হিসেবে থেকে যাবেন. তবে কবি যতীন্দ্র মোহন যে বিষয় বর্ণনার মাধুর্য্যে বা মনোরম দৃশ্য পট আঁকায় --এক ব্যতিক্রমী উজ্জ্বল প্রতিভা একথা অস্বীকার করার উপায় নেই . এই প্রসঙ্গে তাঁর বিখ্যাত 'হাট 'কবিতার কয়েকটি লাইন উল্লেখ করি -
'দূরে দূরে গ্রাম দশ বারো খানি
মাঝে একখানি হাট
সন্ধ্যায় সেথা জ্বলে না প্রদীপ
প্রভাতে পড়ে না ঝাঁট --------'
অনুরূপ
'যৌবন চাঞ্চল্য 'কবিতার কয়েকটি লাইন -
'ভুটিয়া যুবতী চলে পথ
আকাশ কালিমা মাখা
কুয়াশায় দিক ঢাকা
চারিধারে কেবলই পর্বত
যুবতী একেলা চলে পথ -----'
বর্তমান বিদ্যালয় স্তরের পাঠ্যক্রম থেকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ছাড়া এমন অনেক প্রতিভাবান কবি ও লেখক বাদ পড়েছেন. এক কথায় মূল্যবোধ বর্জিত এক নীরস পাঠ্য সূচি বিশেষ করে বাংলা বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে. নীতিকথাও আর পড়ানো হয় না. তাই ছাত্র -ছাত্রীদের মধ্যে পারস্পরিক সহানুভূতি সর্বোপরি মূল্যবোধের অভাব প্রকট হয়ে পড়েছে. সমাজ জীবনে তার দীর্ঘ ছায়া লক্ষ করা যাচ্ছে.
Post a Comment