সময়ের কাছে কেন আমি বা কেন মানুষ'
মহাপৃথিবীর মহাযজ্ঞের কবি শম্ভু রক্ষিত
তৈমুর খান
একজন কবি তাঁর চেতনালোকে মহাতরঙ্গের আলোকরশ্মি নিয়ে জেগে উঠেন। তাঁর সৃষ্টিতে তাঁর নিজস্ব ঈশ্বরের ছায়া পতিত হয়। সুতরাং তাঁর জগৎ নিজস্ব সৃষ্টির জগৎ । কবি শম্ভু রক্ষিতও (১৯৪৮-২০২০) যে জগৎ সৃষ্টি করে গেছেন তা সম্পূর্ণ আলাদা এবং ব্যক্তিগত। একদিকে শৈল্পিক সিদ্ধির অন্বেষণ, অপরদিকে নিজস্ব বাতাবরণ যা আশ্রয় ও ভাবনার নিরাপত্তাদানকারী অমর শব্দকল্পের তির্যক ও রহস্যময় একটি ক্ষেত্র। আমরা যাকে শৈল্পিক মুক্তি ও যুক্তিহীন স্রষ্টার প্রগলভ বলতে পারি।
শম্ভু রক্ষিত চিরদিনই মূলস্রোতের কবিদের কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। বিশুদ্ধ কবিতার পত্রিকা 'মহাপৃথিবী' সম্পাদনা করে কবিতায় মহাপৃথিবীর অন্বেষণ করেছেন। হাংরি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। প্রথম জীবনে সম্পাদনা করেছেন 'ব্লুজ' পত্রিকা। অর্ডিন্যান্স জারির বিরুদ্ধে লিখলে তাঁকে হাজতবাসও করতে হয়। একদিকে অভাব, মোহহীন জীবনযাপনের সারল্য, তথাকথিত শহরকেন্দ্রিক জীবন থেকে দূরে অবস্থান, নির্ভীকভাবে কবিতার শব্দযাপন, ব্যাকরণ-প্রকরণের ঊর্ধ্বে লিখন ভঙ্গি আয়ত্ত করার ক্ষেত্রে তাঁকে সাহস যুগিয়েছিল। ১৯৭১ সালে প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থ : 'সময়ের কাছে কেন আমি বা কেন মানুষ' এবং দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ: প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না' সকলের কাছে কবিকে পরিচিত করে তুলেছে। দ্বিতীয় কাব্যের প্রচ্ছদে রঘুনাথ গোস্বামী একটি অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। রমণীর শ্বেতবর্ণ চোখের সঙ্গে অশ্রুজলের ফোঁটাও কৃষ্ণবর্ণা কালিকার দিগবসনা মূর্তি। তাঁকে আবার নীল সরস্বতীও মনে হয়। তার যৌনাঙ্গ আছে, আবার নিঃশব্দ রক্ত-মাংসও। তাঁর আদিগন্ত-স্তনে ব্যবধানহীন কবি বেঁচে থাকেন। প্রণতি জানান। একদিকে প্রেমিকা, আর একদিকে মাতৃস্তব। অনন্তের এই মহাপৃথিবী অনবদ্য রূপ পরিগ্রহ করে। তাঁর আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হল: 'রাজনীতি', 'পাঠক, অক্ষরগুলি','সঙ্গহীন যাত্রা','আমার বংশধররা', 'আমি কেরর না অসুর', 'ঝাড় বেলুনের জোট' ইত্যাদি। কবি বলেছেন: 'কবিতা ছাড়া অন্যকোনও পবিত্রতায় আমার বিশ্বাস নেই' সুতরাং বুঝতে পারি তিনি ঈশ্বরের দোসর হিসেবেই কাব্যজগতে পদার্পণ করেছিলেন। কবিতার অনবদ্য সেই উচ্চারণ :
'বর্ণনিরূপক যন্ত্র আমাকে গ্রাহ্যই করে না
ধোঁয়া ধুলো কুণ্ডলী হয়ে ঘুরে সরু হয়ে নেমে আসে
পৃথিবী আমার মতো প্রতিষ্ঠিত কুৎসিত হয়ে যায়'
অন্তহীন প্রজ্ঞায় বারবার বেজে ওঠে এই ধ্বনি।
শম্ভু রক্ষিত প্রথম থেকেই কাব্যজগতে ছন্দের দোলাচল নিয়ে প্রবেশ করেননি। অলংকারের কৃত্রিম আভিজাত্যও তাঁর ছিল না। সেই ছলনাহীন টানা গদ্যকেই তিনি ভরসা করেছিলেন। শব্দ ভেঙে শব্দ গড়েছিলেন। নৈঃশব্দের রসায়নেও কল্পনার জারক মিশিয়ে ছিলেন যা ছিল নিজস্ব কিউবিজম ধারণায় সৃষ্ট এক জগৎ। আমরা জানি : Cubism did not accept the logical consequences of its own discoveries; it was not developing abstraction towards its own goal, the expression of pure reality.
(Piet Mondrian)
অর্থাৎ কিউবিজম তার নিজস্ব আবিষ্কারগুলির যৌক্তিক পরিণতি গ্রহণ করেনি। এটি তার নিজস্ব লক্ষ্য।যা বিশুদ্ধ বাস্তবতার প্রকাশের দিকে নয়। এই ধারা থেকেই শম্ভু রক্ষিত নিজের কবিতায় যে বাস্তবতা সৃষ্টি করেছিলেন তা প্রকৃত বাস্তব ছিল না। 'সোনার দাসী' কবিতায় তিনি লিখেছেন:
'সোনার দাসী যাকে প্রজাপতির মতো দেখতে
আমি চোখ বুজে শুঁকি তার টকটকে লাল সিল্কের জামা, গর্ভের শিরা
যার শুকনো অল্প চুল মাথার ওপর দুভাগ হয়ে
আমার কানের পাশে জটার মত ঝোলে।'
সোনার দাসীর চুল কবির মাথার কানের পাশে জটার মতো ঝোলে। তখন বোঝা যায় সোনার দেশে আর কেউ নন, কবির আর একটি সত্তা। কবিতার পরবর্তী অংশে লিখেছেন:
'আমি সোনার দাসীর মনের কথা চিন্তা করি, সগর্বে উদাসীন হই
ফলে সোনার দাসী ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ে
বায়ুমণ্ডলের মতো তাকে মনে হয়'
সোনার দাসী ব্যক্তি থেকে নৈব্যক্তিক প্রকৃতি হয়ে যায়। কিউবিজম ধারার কবিতায় কবির সৃষ্ট জগৎ ও প্রকৃতিই প্রধান লক্ষ্য। শিল্পী বা কবিই তার বাস্তবতা ও গোলকধাঁধার সৃষ্টি করেন। পাল সেজান এই প্রসঙ্গে বলেছেন: Art is a harmony parallel with nature.(Paul Cezanne,Cezanne. Mont Sainte Victoire)
অর্থাৎ শিল্পও প্রকৃতির সমান্তরালভাবে গড়ে উঠবে।
শম্ভু রক্ষিতের কবিতাগুলিতে প্রকৃতির সঙ্গে অন্তর্লীন মানবীয় প্রবৃত্তির এক সমান্তরাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। নিজস্ব বাস্তবতার ভিত্তিতেই আত্মরতির স্ফুরিত অবগাহনে কবি নিজস্ব ছায়াতেই সম্মোহিত হয়েছেন। নার্সিসাস স্বয়ংক্রিয় ও বহুমুখী জীবনের স্বতশ্চলতাকে সক্রিয় করে তুলেছে। স্বাভাবিকভাবেই কবির ক্ষরণ ও শোভনের পর্যায়গুলি ছাপিয়ে গেছে প্রত্ন-প্যাশনে। বাস্তবের রূঢ়তা ও কদর্যতা নান্দনিক মোহটানে দুর্বার এক প্রাচুর্যতায় ভরে গিয়েছে। সহজ অনাড়ম্বর উপমাহীন ভাষায় উন্মোচিত হয়েছে নিজস্ব মহিমার মূর্তি। আত্মজগতের নির্মীয়মাণ প্রক্রিয়া তাই আবহমান হয়ে উঠেছে :
'আমি বেশ কয়েকটি অক্ষরকে নিয়ে
সোনালি নস্যি রঙের ফ্রককোর্ট পরে
বিষুবরেখার কয়েক ডিগ্রি ওপরে উঠেছি'
( পাঠক, অক্ষরগুলি)
কবি অবাধ, মুক্ত। তাই সৃষ্টিতত্ত্বও কোনো বাধা মানেনি। অন্তহীন খেলার ভেতর অন্তহীন রূপের গঠন প্রক্রিয়া চলেছে। কবি বীভৎস মুহূর্তে কখনো অক্ষরগুলির বোঝা নামিয়েছেন। তাদের মধ্যে সৃজনীশক্তি লুকিয়ে আছে কিনা দেখেছেন। অতি সুস্বাদু মাছ দিয়ে তাদের বাতাস করেছেন। আবার তাদের রূপসী হৃদয় রম্বস বৃত্ত সামন্তরিক গড়ন নিয়েছে। কবি বলেছেন:
'পাঠক,অক্ষরগুলি এলেমদার উদ্যত এখন
একটু হেসে আমাকে ব্যাখ্যা করতে পারছে
অসম্ভব উৎস থেকে বেরিয়ে এসে
মন্থর আশ্বস্ত পায়ে
অগোচর লক্ষ্যে হারিয়ে যেতে পারছে
আমার শাশ্বতের মূল টেনে আনতে পারছে'
(পাঠক, অক্ষরগুলি)
এই 'শাশ্বতের মূল' ব্রহ্মযাপনের অবিনশ্বর উৎস। যার প্রকাশ ও অপ্রকাশ দুইই আছে। সমূহ সৃষ্টিসত্তা তার কাছেই নিবেদিত।
'মড়িঘর' নামক কবিতায় কবির শব্দ ব্যবহারে আরও দুর্বার গতি এসেছে। শব্দ ব্যাকরণসম্মত না হলেও ক্ষতি নেই। শুধু স্বয়ংক্রিয় এক পর্যটনের ভেতর কবির যাত্রা অব্যাহত:
'আমি শৌখিন,বরতরফ।আমার চারধার অতিপ্রোন্নত
পাবক সন্ধান করে কারুকার্য করা
বিশেষ রঙিন শান্ত পা-যা প্রাকৃত কীর্তির তলায়
প্রায়ই নিস্বপ্ন করে দেখায় গন্ধ,অনেক শোয়ানো শরীর আকণ্ঠ উন্মুখ
পরিবর্তন অভ্যর্থনা সৃষ্টি করে আকাশরশ্মির মতো
তার দৃষ্টিতে এমন সমস্ত চিত্র
ঊর্ধাকাশের বায়ুমণ্ডলের ওপর তার পতি কেঁপে উঠেছেন।'
উল্লেখ্য এই কবিতায় প্রেক্ষক, যন্ত্রের ঢিপি, বসুন্ধরার শৈবাল, ভ্রূণ বের করা দাঁত,প্রসক্ত, প্রীয়মাণ, মেধাবিনী, শস্যপ্রসূ প্রভৃতি বহু শব্দ সৃষ্টি করেছেন ও ব্যবহার করেছেন। 'বঙ্গদেশে টুপি' নামক কবিতায় 'বঙ্গালে টুপির সংস্কার ও টুপির প্রসার সংক্রান্ত 480 পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট বিখ্যাত হয়ে থাকে।' পড়তে গিয়ে তাকে কবিতা বলে মনেই হবে না। কিন্তু কবিতাটিতে এমন এমন শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে যার কোনো অর্থও নেই অথচ কবিতায় ব্যবহৃত।যেমন : অজঅ,অধমাধব
2×2, আ-মু-খ-দরদের, শ্রীগেগং, আপাং, কনডেনসর ইত্যাদি।
টুপি পরার সঙ্গে বাঙালির বিপ্লব, আন্দোলন, ইতিহাস ও পরিবর্তন,সংস্কৃতি ও আচার জড়িয়ে আছে । তাই কবি বলেছেন প্রত্যেকেই টুপি পরেছে। কবিতাকে নিজস্ব চালেই আত্মনিষ্ঠ কথনের বুননে বিবৃতিধর্মী গদ্য শব্দ ব্যবহার করে ব্যাকরণহীন পথে নিয়ে যেতে পেরেছেন । কিউবিজমের এটাই হল মূলকথা:Maybe cubism started this way. Memory re-arranging a face.(Mary Rakow, The Memory Room)
সম্ভবত কিউবিজম এভাবেই শুরু হয়েছে স্মৃতিকে সম্মুখে পুনরায় স্থাপিত করার জন্য। শম্ভু রক্ষিত ইতিহাস এবং অতীতের সংস্কৃতি এবং চেতনাকে বিবৃতির ভেতর তুলে আনলেন যা আর কবিতা থাকল না অথচ একটা নতুন পথের সৃষ্টি হল। বিভিন্ন মাত্রার আলোছায়ার পুনঃপৌণিক ব্যবহার দেখা গেল তাঁর কবিতায়। কবির ব্যক্তিগত আবেগ অনুভূতির প্রকাশ কম। বিষয়বস্তুরও সম্পূর্ণতা নেই। আদিম ভিত্তির উপর বিষয়কে দাঁড় করানোর পথই কবি অবলম্বন করলেন। সমগ্রতা নয় সবকিছুকে খন্ডিতভাবে দেখেই কাব্য যাপনের পথ ধরলেন। একাধিক দৃষ্টিকোণ আরোপ করে, বিষয়কে ভেঙে, জ্যামিতিক আকারের ওপর রূপ জুড়ে দিয়ে, ইচ্ছেমতো তাকে পাল্টে দিয়ে সৃষ্টি করলেন নিজের বাস্তব জগৎ। অসংখ্য দৃশ্যপট, ক্রিয়া সংযোগ, অলংকারবিহীন আবেগবিহীন বিজ্ঞান ও গণিতের ভেতর ভাবনাকে চালিত করে নিজের স্বার্থেই অবিচল থাকলেন। কবিদের এই বাস্তবতা একটা উপায়মাত্র:Cubism is ... a picture for its own sake.Literary Cubism does the same thing in literature, using reality merely as a means and not as an end."
(Max Jacob, The Cubist Poets in Paris: An Anthology)
সুতরাং এটি শেষ কথা নয়। শম্ভু রক্ষিত 'প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না'য় লিখেছেন:
'তুমি ঈশ্বরকন্যা, তুমি আমাকে বিশুদ্ধ কবির জনক হতে সেদিন শেখালে
ব্যক্তিগত মৌলিক দৃশ্য থেকে ধূসর বিষয়ে আমি, ব্যক্ত অব্যক্তের
অবাস্তব মুহূর্তের স্বতন্ত্র আমি, আমার গভীরতর সাম্রাজ্যে তুমি আছো, তুমি নেই
তোমার আশ্চর্য হবার মতো বিশুদ্ধ প্রীতি, কৃত্রিম পদ্ধতিতে আকাশেও
ওড়ার ব্যাপারে তুমি বয়সে প্রবীণ'
এই ঈশ্বরকন্যাই কবির সেই স্বয়ংক্রিয় সত্তা যা আদিম প্রকৃতিপ্রদত্ত সব বাস্তবতার ঊর্ধ্বে নিজস্ব বাস্তবতার ক্ষেত্রে কবিকে অবগাহন করিয়েছে। তাই তার বয়সে প্রবীণতা, গতিতে দুরন্ত, গভীর মেধাবিনী, পূর্ণ ও সারসত্যের পথপসারী। কল্পনার দুয়ার খুলে নিভৃত সৃষ্টিজগতে সর্বদা আহ্বান জানায়। এই সেই 'প্রিয় ধ্বনি' যার দ্বারা কবি একা, সঙ্গীবিহীন। নিজের তেজকে ত্রিধাবিভক্ত করেছেন। হৃদয়কে বায়ু দ্বারা বর্ধিত করেছেন। বিজয়স্তম্ভ নির্মাণ করার পরিকল্পনা করেছেন। শত্রুকে মৃতসঞ্জীবনী খাইয়েছেন। সাদা অস্বচ্ছ ধোঁয়া ও শৃগালের গুঞ্জরন নিয়ে প্রলয়ের আকর্ষণীয় স্বচ্ছ পর্দার মতো আন্দোলিত তরঙ্গে চলে গিয়েছেন। অর্থ নয়, বিষয় নয়, ক্রিয়ার ভেতর স্বয়ংক্রিয় 'জটিলযৌগিক পদার্থ' 'ক্ষয়প্রাপ্ত স্নেহন'। পৃথিবীর নিচে উৎকীর্ণ গ্রহের পার্থিব প্রাণীর মতো জিভ চিরকাল পূর্ণ করেছেন। এই রহস্য রহস্য হয়েই থেকে যাবে কবিতায়। কবির ক্রিয়া পাক খাবে পড়ন্ত পৃথিবীর মহাযজ্ঞে, আর একটি মহাপৃথিবীতে।
শম্ভু রক্ষিত এর ছবি
Post a Comment