প্রশ্ন : তখন থেকেই আপনি উপন্যাস লেখাতে অনাগ্রহী হয়ে পড়লেন। দেখা গেল সাহিত্যের এই রীতির সঙ্গে আপনার ঝগড়া লেগে গেল। কেন?

শংকর ব্রহ্ম



নোবেল বিজেতা পোলিশ কবি চেসোয়াভ মিউশ, তাঁর কবিতা ও সাক্ষাৎকার


শংকর ব্রহ্ম


অষ্টম পর্ব


প্রশ্ন : এই মুক্তিতে কে সহায়তা করেছিল বলে আপনি মনে করেন?


মিউশ : আমার উপন্যাস ইসা ভ্যালিতে রাজনৈতিক কিছুই নেই। ঘটনাটি ঘটে ১৯২২ সালের দিকে লিথুয়ানিয়ার গ্রামে।  এক যাজকের এক রক্ষিতা ছিল আর সে একদিন আত্মহত্যা করল, তারপর গির্জাপল্লীতে ঘুরে বেড়াতে লাগল।  সম্প্রতি পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো লিথুয়ানিয়ায় গিয়ে আমি সেই গীর্জা-এলাকা পরিদর্শন করি। আমার যেখানে ব্যাপ্টাইজম হয়েছিল এবং আমার উপন্যাসের অনেক ঘটনা যেখানে ঘটেছিল যা আমি বর্ণনা করেছিলাম উপন্যাসে, সেই একই গীর্জার কাছেই স্থানীয় গোরস্তানে ছিল মেয়েটির কবর। কিন্তু উপন্যাসটি শুধু শৈশবের স্মৃতিরোমন্থন নয়, বরং শয়তান এবং ঐতিহাসিক বিশ্ববিধি ও প্রকৃতির  নিষ্ঠুরতা  থেকে নিজেকে মুক্ত করার আকাঙ্ক্ষাসংক্রান্ত এক দার্শনিক উপন্যাস।


প্রশ্ন : তখন থেকেই আপনি উপন্যাস লেখাতে অনাগ্রহী হয়ে পড়লেন। দেখা গেল সাহিত্যের এই রীতির সঙ্গে আপনার ঝগড়া লেগে গেল। কেন?


মিউশ : এটি একটি অবিশুদ্ধ ফর্ম। বার্কলিতে আমি বিশ বছর দস্তয়েভস্কি পড়িয়েছি। তিনি একজন জাত ঔপন্যাসিক, সবকিছুই তিনি ত্যাগ করেছেন; সম্মানের কোনো ধার ধারতেন না। উপন্যাসে তিনি সবকিছুই ঠেসে দিতেন। জেনারেল ইভোলগিন নামে একটি চরিত্র তিনি সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইডিয়ট উপন্যাসে, যে একজন মিথ্যাবাদী আর গল্প বলে বেড়ায় – কীভাবে সে যুদ্ধে তার পা হারায়, কীভাবে সে তার সেই পাকে কবর দেয়, আর তারপর সে সমাধিফলকে কী লিপি উৎকীর্ণ করে। উৎকীর্ণলিপিটি নেওয়া হয়েছিল দস্তয়েভস্কির মায়ের সমাধি থেকে। এখানে আপনি পাবেন সত্যিকারের একজন ঔপন্যাসিককে। আমি তা করতে পারিনি।


প্রশ্ন : যদিও উপন্যাস নামের রীতিটি আপনার সঙ্গে খাপ খেল না, তবু টমাস মানের ভক্ত ছিলেন আপনি, এমনকি ‘ম্যাজিক মাউন্টেন’ নামে একটি কবিতাও লিখেছেন।


মিউশ : ছাত্রাবস্থায় দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন আমাকে মুগ্ধ করেছিল। সেখানে নাফটা নামে একটি চরিত্র আছে যে-একজন জেসুইট যাজক, আলোকপ্রাপ্তির বিরুদ্ধে অবস্থানকারী একজন একচ্ছত্রবাদী। আমি এই চরিত্রে আবিষ্ট ছিলাম। আমার নিজের ছিল বামপন্থী সর্বগ্রাসী প্রবণতা আর সেজন্যই আলোকপ্রাপ্তির বিষয়ে নাফটার সন্দেহের বিষয়টাতে আটকে গিয়েছিলাম আমি। এখন যদিও উপন্যাসে নাফটার প্রতিদ্বন্দ্বী আলোকপ্রাপ্তির চৈতন্যের প্রতিনিধিত্বকারী সেটেমব্রিনির দিকেই আমার পক্ষপাত। কিন্তু মানবতা বিষয়ে আমার অন্তর্দৃষ্টি সেটেমব্রিনির থেকেও অধিক অন্ধকারময়।


প্রশ্ন : অবরোধের সময় আপনি ইংরেজি থেকে পোলিশ ভাষায় এলিয়ট অনুবাদ করেছিলেন। এ-কাজে কেন আপনি আগ্রহী হলেন?


মিউশ : পোড়ো জমির পুরোটাই বিপর্যয়ের উপাদানে ভরা।  সে-সময়ে, অধিকৃত ওয়ারশতে, ধসেপড়া শহরের চিত্রকল্পে এর ছিল কিছু সুনিশ্চিত ক্ষমতা। পুড়ে যাওয়া গেটোর আগুনের বিচ্ছুরণ যখন দিকচক্রবালে ছড়িয়ে পড়ত, তখন তা অতিপ্রাকৃত পাঠের সৃষ্টি করত। এটা গভীরভাবে এক শ্লেষাত্মক কবিতা, বা এমনকি বিদ্রূপাত্মকও। এটি আমার চিন্তার সঙ্গে খাপ খায় না। কিন্তু চৌতালে আমরা এমন বিরল ও ব্যতিক্রম একজনকে পাই, যিনি অনেক সংগ্রামের পর শিল্পের মাধ্যমে তাঁর নিজ বিশ্বাসে ফিরে আসতে সমর্থ হন। এলিয়টের সঙ্গে লন্ডনে আমার দেখা হয়, আর তিনি আমাকে উষ্ণ অভিবাদনও জানান। পরে তাঁকে আমি আমেরিকাতে দেখি এবং পোলিশ ভাষায় তাঁর আরো কবিতা অনুবাদ করি।


প্রশ্ন : এলিয়টের মতো আপনিও কি মনে করেন, কবিতা ব্যক্তিত্ব থেকে পলায়ন?


মিউশ : সর্বদাই এটা আমার জন্য এক সমস্যা। সাহিত্য এমন-এক আকাঙ্ক্ষা থেকে জন্ম নেয় যা সত্যনিষ্ঠ হতে চায় – কোনোকিছুকে লুকাতে চায় না, আর একজনকে অবিকল উপস্থাপন করতে চায় না। তবু যখন আপনি লেখেন তখন কিছু নির্দিষ্ট বাধকতা থাকে, যাকে আমি বলি ফর্মের নিয়মনীতি। আপনি সবকিছু বলতে পারেন না। অবশ্যই এটা ঠিক যে, মানুষ কোনোরকম সংযম ছাড়াই অনেককিছু বলে। কিন্তু কবিতা কিছু সংযম আরোপ করে। তথাপি এমনই মনে হয় যে, আপনি নিজেকে বিস্তৃতভাবে প্রকাশ করতে পারেননি। বই লেখা হয়, তা প্রকাশিত হয় আর ভাবি, ঠিক আছে পরবর্তী সময়ে আমি নিজেকে উন্মুক্ত করব। আর যখন পরের বইটি বের হলো, একই অনুভূতি আমার হয়। আর তারপর জীবন শেষ হয়ে যায়, আর এ-ই ঘটে।


প্রশ্ন : আপনার অনেক কবিতায় স্বীকারোক্তি দৃষ্টিগোচর হয়। আপনি কি মনে করেন এই স্বীকারোক্তি কোনো কিছুকে নির্দেশ করে?


মিউশ : আমি জানি না। আমি কখনো মনোবিকলিত হইনি। মনোরোগচিকিৎসার ব্যাপারে আমি খুব সন্দেহপরায়ণ। আমার স্বপ্ন হলো, ভাষায় সবকিছু প্রকাশ করা আর সবকিছু বলা। কিন্তু সম্ভবত আমি পেরে উঠব না, আর উপরন্তু, কোনোকিছুই তা নির্দেশ করবে না।


প্রশ্ন : আপনার লেখার পদ্ধতিটি কেমন?


মিউশ : আমি প্রতিদিন সকালে লিখি। এক পংক্তি বা দু পঙ্ক্তি যা-ই হোক না কেন, কিন্তু তা সকালে। আমি নোটবুকে লিখি আর তারপর কম্পিউটারে খসড়া করি। লেখার সময় আমি কফি বা অন্য কোনো উত্তেজক কিছু কখনোই নিই না। আমি পরিমিতভাবে পান করি, কিন্তু তা কাজ শেষ হওয়ার পর। সম্ভবত এ-কারণেই নিউরোটিক আধুনিক লেখকদের ইমেজের সঙ্গে আমি খাপ খাই না, কিন্তু কে জানে?


প্রশ্ন : আপনি কি লেখা খুব বেশি মাত্রায় সংশোধন করেন?


মিউশ : এমন কোনো নিয়ম  নেই। কখনো পাঁচ মিনিটে একটি কবিতা লেখা হয়, কখনো বা একমাসও লেগে যায়। কোনো নিয়মনীতি নেই।


প্রশ্ন : আপনি কি প্রথমে পোলিশ ভাষাতেই লেখেন, তারপর ইংরেজিতে অনুবাদ করেন?


মিউশ : আমি কেবল পোলিশ ভাষাতেই লিখি। আমি সবসময় কেবল পোলিশ ভাষাতেই লিখেছি, কারণ আমি মনে করি, যখন আমি আমার শৈশবের ভাষাকে ব্যবহার করি, তখনই কেবল আমি আমার ভাষার সেরা কেরামতিটি দেখাতে পারি।


প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন আপনার কবিতা ভালোভাবে অনুবাদিত হতে পারে?


মিউশ : আমি নিজেই আমার কবিতা অনুবাদ করি, তারপর আমার বন্ধুরা, অধিকাংশ সময়েই রবার্ট হাস বা লেনার্ড নাথান, এগুলো সংশোধন করেন। কিন্তু মৌল ছন্দটা আমিই ঠিক করে দিই, কারণ তাঁরা পোলিশ ভাষাটা জানে না। আমি বিশ্বাস করতাম না যে, আমার কবিতা অনুবাদিত হতে পারে। আমি খুবই ভাগ্যবান যে, আমেরিকান পাঠকদের সঙ্গে আমি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারি। এসব পাঠকের অর্ধেকই প্রায় হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় উদ্গ্রীব কবি। তারা  কবি হিসেবে আমাকে খুবই তারিফ করে। যেমন পোলসের কাছে আমি যে-কোনো কিছুর চেয়ে বেশি এক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব।


প্রশ্ন : আপনি নিজেকে একজন গুহ্য অপ্রচারযোগ্য কবি বলেছেন। আপনি কি পাঠককে চিন্তা করেন না?


মিউশ : আমি সে-ধরণের আদর্শ ব্যক্তিদের জন্যই লিখি যারা ঠিক আমার অন্তরঙ্গ ধরণের। অতিমাত্রায় সহজগম্য হওয়া নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না। আমি দেখি আমার কবিতা কতটুকু যথার্থ, কতটুকু অপরিহার্য। আমি ছন্দোস্পন্দ  আর ক্রমকে অনুসরণ করি। আর আমার সংগ্রাম হলো বিশৃঙ্খলা ও শূন্যতার বিরুদ্ধে, যেন আমি যতটা সম্ভব বাস্তবতার নানা ধরণকে ফর্মে নিয়ে আসতে পারি।


প্রশ্ন : সাম্প্রতিক একটি কবিতা ‘মাকড়সা’য়, আপনি কবিতাকে রূপকার্থে বলেছেন, ‘ …সময়ের সীমান্তরেখার ওপারে দাঁড় টানার জন্য/ এক ছোট্ট নৌকা বানানো।’ এভাবেই কি আপনি নিজের কাজকে দেখেন?


মিউশ : আমি খোলস ছাড়ার রূপক ব্যবহার করতে পছন্দ করি, যার অর্থ পুরনো ফর্ম এবং ধারণা বাতিল করা। আমি মনে করি, এটাই লেখাকে উদ্দীপক করে তোলে। আমার কবিতা সবসময়ই ফর্মের এক অধিকতর পরিসরকে অন্বেষণ করে। যে-সমস্ত কবিতার তত্ত্ব নান্দনিক বস্তুকে ঘিরে আবর্তিত, তার সঙ্গে আমার সার্বক্ষণিক দ্বন্দ্ব লেগেই আছে। যদিও কোনো না কোনোভাবে আমি খুশিই যে, আমার কিছু পুরনো কবিতা লেখার ধরণ আমার থেকে আলাদা হয়েও তাদের নিজের ধাঁচে ভালোভাবেই এখনও অস্তিত্বশীল।


প্রশ্ন : তাহলে যখন একজন কবি বা শিল্পী প্রশংসিত হন এবং উচ্চ ধারণায় অবস্থান করেন, তখন কেন আপনি প্রায়শই সে-বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন?


মিউশ : সমস্যা হলো, জনসাধারণ সাধারণত কোনোরকম দ্বন্দ্ব-সংঘাতহীন এবং জীবন যা দেয় তার চেয়েও অধিকতর বিশাল এক সুন্দর-অঙ্কিত প্রতিকৃতি প্রত্যাশা করে। এই ধরণের প্রতিকৃতি আর বাস্তবতার মধ্যে বৈষম্য থাকে, যা হতে পারে হতাশাজনক। একজন কবি যদি খুব সীমাবদ্ধ বৃত্তে খ্যাতি পান, তাহলে এটারই সম্ভাবনা থাকে যে, তাঁর ভাবমূর্তি বিকৃত হবে না। বৃহত্তর ক্ষেত্রে বিকৃত হওয়ার বেশি ঝুঁকি থাকে।


প্রশ্ন : আপনার নিজের কী ধরণের বিকৃতিকে ব্যাপক সমস্যা বলে মনে হয়?


মিউশ : আমার নীতিবাগীশ ভাবমূর্তি।  নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর পোল্যান্ডে যখন আমার কবিতার ওপর নিষেধাজ্ঞা উঠে গেল, অনেকের কাছেই আমি হয়ে উঠলাম সেন্সরশিপ থেকে বেরিয়ে আসা এক মূর্ত স্বাধীনতার প্রতীক, আর এজন্যই হয়ে গেলাম এক নৈতিক ব্যক্তিত্ব। আমি জানি না আমি এই ভাবমূর্তিকে ধরে রেখেছি কি না, এটা সম্ভবত আগের তুলনায় একটু হলেও খেলো হয়ে গেছে। এই যে দেখুন (মিউশ তাঁর পকেটে কী-একটা হাতড়ালেন আর একটি পদক পেলেন), এটা পোল্যান্ডের মনুমেন্টের একটি  রেপ্লিকা। এর চারটি প্রতীক আছে : পোপ দ্বিতীয় জন পলের সম্মানচিহ্ন, পোলিশ আর্চবিশপের মুকুট, লেস ওয়ালেসার যন্ত্র আর একটি বই, যা আমার প্রতিনিধিত্ব করে।


প্রশ্ন : আপনি তো ভালো সাহচর্যেই আছেন।


মিউশ : বিংশ শতাব্দীর একজন কবির জন্য ভাগ্য খারাপ নয়, বিশেষত মানবসমাজে কবিতার স্থান নিয়ে যেসব খেদ বিদ্যমান তার আলোকে। কিন্তু আমি তা নিয়ে একটু সন্দেহগ্রস্তই। পোলিশ ইতিহাসের বিশাল নৈতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমি চিন্তিত হতে চাই না। একটি নৈতিক জীবনযাপনের সমস্যা হিসেবে শিল্প পর্যাপ্তভাবে প্রতিস্থাপনীয়  নয়। আমি আমার চেয়েও বড় কোনো ঘড়ি পরতে ভয় পাই।


প্রশ্ন : আপনি কি মনে করেন, অজানা ও অখ্যাতভাবে কাজ করাই একজন কবির জন্য ভালো?


মিউশ : বহু বছর আমি অজ্ঞাতভাবে কাজ করেছি। বার্কলিতে আমার বছর ও সময়গুলো এমন ছিল যে, এখানে প্রকৃতপক্ষে আমার কোনো পাঠক ছিল না, আর আমেরিকায় এমন মানুষ সত্যিই কম ছিল যাদের বিচারবোধের ওপর আমি ভরসা করতে পারতাম। পারি এবং পোল্যান্ডে আমার কয়েকজন বন্ধু ছিল, সুতরাং পত্র-যোগাযোগ এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল : কয়েকজন বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া চিঠিগুলোই ছিল আমার বাঁচার শক্তি। পোলিশ ভাষায় আমার কবিতার বইগুলো বের হচ্ছিল। সেগুলো পোল্যান্ডে  বেআইনিভাবে বিক্রি হচ্ছিল, সুতরাং  পোল্যান্ডের পাঠকদের প্রতিক্রিয়া জানারও সুযোগ ছিল না আমার তখন।


আমি জানতাম আমি কী, আর আমার মূল্য সম্বন্ধেও আমি ওয়াকিবহাল ছিলাম, কিন্তু বার্কলিতে, অবশ্যই এক্ষেত্রে স্লাভিক ভাষার অধ্যাপকেরা ছাড়া, আমার প্রায় সকল সহকর্মীর কাছেই আমি ছিলাম অজ্ঞাত। এক অখ্যাত বিভাগের এক অখ্যাত অধ্যাপক ছিলাম আমি। যখন আমি দস্তয়েভস্কি পড়াতে শুরু করলাম, তখনই আমি ছাত্রদের কাছে পরিচিত হয়ে উঠলাম। এ-সময়টাকে বোঝার জন্য একটি গল্প রয়েছে। জার্সি কোজিনস্কির সঙ্গে স্ট্যানফোর্ডে এক সাহিত্যিক নৈশভোজে আমি ছিলাম, আর অবশ্যই তিনি তখন বিখ্যাত একজন। সেখানে কোজিনস্কির ভক্ত একজন ভদ্রমহিলা ছিলেন যিনি টেবিলে আমার কাছেই বসেছিলেন। তিনি ভদ্রভাবে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কী করি। আমি বললাম, আমি কবিতা লিখি। তিনি তখন কর্কশভাবে বলে উঠলেন, সবাই কবিতা লেখে। আমি বেশি কিছু মনে করলাম না, কিন্তু ঘটনাটি এখনো আমাকে কষ্ট দেয়। তখনকার বছরগুলোতে আমার অবস্থা, আমার উচ্চাকাঙ্ক্ষার দুঃখকষ্টের ব্যাপারটা এ-ঘটনায় ধরা পড়ে।


প্রশ্ন : তুলনামূলকভাবে আপনার অধিকসংখ্যক পাঠককে আপনি কীভাবে বিবেচনা করেন?


মিউশ : অনেক বছর আগে একসময় ছিল যখন মানুষকে আনন্দ দিত, এমন ধরণের লেখার জন্য আমি স্বীকৃতি পেয়েছিলাম। কিন্তু সে-সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। যখন আপনি রাজনৈতিক কবিতা লিখবেন, যেমনটা আমি যুদ্ধের সময় লিখেছিলাম, তখন সবসময় আপনার কবিতার খদ্দের থাকবে। যে-স্বীকৃতি আমি পাই, তার জন্য আজকাল আমি আশ্চর্য হই এবং অস্বস্তিতেও ভুগি। কারণ আমি জানি যে, এই সাড়া খুব খাঁটি, আর এজন্য নয় যে, আমি নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত। অপরদিকে, আমি মনে করি না যে, নোবেল পুরস্কার আমাকে বা আমার কাজকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।


প্রশ্ন : ওয়ালেস স্টিভেনসের ধারণা অনুযায়ী, আধুনিক কবিতা হলো ‘প্রয়োজনকে খোঁজার লক্ষ্যে মনের ক্রিয়ার কবিতা’, কীভাবে আপনি  একে দেখেন?


মিউশ : সাহিত্য ও কবিতা এখন বৈজ্ঞানিক চিন্তাপ্রণালী এবং অভিজ্ঞতালব্ধ চিন্তাপ্রণালীর মারাত্মক চাপের সম্মুখীন। স্টিভেনসের মর্মভেদী এবং ব্যবচ্ছেদী যে-মন, আমি মনে করি তা কবিতায় প্রয়োগ করা ভুল। আমরা যদি স্টিভেনসের  ‘স্টাডি অফ টু পিয়ার্স’ কবিতাটিকে নিই তাহলে দেখব, অন্য, এক গ্রহ থেকে এক প্রাণী নাশপাতিকে  যেন বা মঙ্গল গ্রহের মতো মনে করে বর্ণনা করার চেষ্টা করছে। এই হলো ব্যবচ্ছেদ। আমি মনে করি, পৃথিবীর বস্তুরাশিকে ব্যবচ্ছেদ না করে বরং গভীরভাবে চিন্তা করা উচিত। বস্তুুর প্রতি  এ-ধরণের নিস্পৃহ মনোভাব যে-কেউ ওলন্দাজ স্টিল লাইফ চিত্রকলায় খুঁজে পাবেন। শোফেনহাউয়ার একেই শিল্পের সর্বোচ্চ রূপ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। এ-ধরণের গভীর চিন্তা জাপানি হাইকু কবিতাতেও দেখা যায়। বাশো বলেছেন, পাইন গাছ নিয়ে লিখতে গেলে তোমাকে পাইন থেকেই শিখতে হবে। জগৎকে ব্যবচ্ছেদ করার চেয়ে তা এক সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। আমি মনে করি, শোফেনহাউয়ার প্রকৃতপক্ষে কবিদের, শিল্পীদের দার্শনিক।


প্রশ্ন : কেন?


মিউশ : কারণ তিনি দূরত্বের প্রয়োজনের ওপর জোর দিয়েছেন। জগতে কাজ করতে গিয়ে আমরা জঘন্য আবেগের চক্রে পতিত হই – আপ্রাণ চেষ্টা আর সংগ্রাম করি উদ্ধারের জন্য। ভারতীয় ধর্মশাস্ত্রের দ্বারা শোফেনহাউয়ার প্রভাবিত হয়েছিলেন; তাঁর কাছে স্বাধীনতা মানে হলো শাশ্বত জন্ম-মৃত্যুর চক্রের বাইরে দাঁড়ানো। শিল্পও হলো এই ঘুরন্ত চাকার বাইরে দাঁড়ানো যেন আবেগ ও অভিপ্সামুক্ত হয়ে আর নিশ্চিত নিরাসক্তি নিয়ে কোনো বস্তুর দিকে আমরা অগ্রসর হতে পারি। নিস্পৃহ গভীর  চিন্তনের দ্বারাই জীবনের সংরাগকে দূর করা যায়, যা শিল্পের এক ভালো সংজ্ঞার্থ : ‘নিরাসক্ত গভীর চিন্তন’। এ কারণেই শিল্পসংক্রান্ত শোফেনহাউয়ারের নির্যাস হলো স্টিল লাইফ। ডাচ স্টিল লাইফ।


প্রশ্ন : দুটো কবিতায়, একটি হলো ‘রাজা রাওকে’, যা ছিল এক কথোপকথনের জবাব, আর একটি সাম্প্রতিক কবিতা যার নাম ‘ক্যাপরি’, আপনি প্রকৃত বর্তমানের জন্য, ইন্দ্রিয়ের দেবত্বরহস্যের জন্য অপেক্ষার উল্লেখ করেছেন। এটা কি এ-ধারণাই দেয় যে, কবিতা হলো এমন এক সংস্কারাত্মক কাজ যার মাধ্যমে আমরা এই বর্তমানকে আহ্বান করতে পারি?


মিউশ : হ্যাঁ, ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি, যে-জগৎকে আমরা জানি তা এক গভীর বাস্তবতার বল্কল, আর এই বাস্তবতাই এখানে  বিরাজমান।  শুধু শব্দে একে সীমাবদ্ধ করা  যায় না, আর এ-জায়গাতেই এ-শতাব্দীর কিছু লেখকের সঙ্গে আমার অমিল। এটা এমন এক ধরণের পার্থক্যের মতো, যখন একজন ভাষাকে, অন্তর্গত জীবনকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে, আর অন্য একজন যে আমার মতো শিকারি, মনস্তাপিত হয় এ-কারণে যে, বাস্তবতাকে ঠিক পাকড়ানো যায় না।


প্রশ্ন : লারকিনের ‘প্রভাতসংগীত’ কবিতাটি আপনার কেমন লাগে যেখানে তিনি মতামত উপস্থাপন করেন যে, ধর্ম হলো এক ধরনের চাতুরী আর তাকে বলেছেন,

 ‘এটি বিশাল এক শুঁয়াপোকা খাওয়া সাংগীতিক কিংখাব

এই ছলনায় সৃষ্ট যে আমরা কখনো মরব না?’


মিউশ : আমি লারকিনের ‘প্রভাতসংগীত’ কবিতাটি  পড়েছি, এটি আমার কাছে মনে হয়েছে একটি জঘন্য কবিতা। আমি লারকিনকে পছন্দ করি না। তিনি ছিলেন একজন দারুণ কারিগর বা ক্রাফ্টসম্যান, বস্ত্ততই এক্ষেত্রে অতি ভালো একজন। রচনাশৈলীর অধিকারী হিসেবে আমি তাঁকে অতিউচ্চাসন দিই, কারণ তিনি আমার এ-ধারণাকে যথাযথভাবে প্রত্যয়িত করেন – ঠিক শুধু ভাবগত সংবেদনকে বিবেচনা না করে পরিষ্কার অর্থময়তাসহ স্পষ্টভাবে কবিতা লিখতে; কিন্তু আমি তাঁর কবিতা পছন্দ করি না, তিনি পছন্দের জন্য অতি লক্ষণাত্মক।


প্রশ্ন : লক্ষণাত্মক কার প্রতি?


মিউশ : বর্তমান, মারাত্মক বিশ্বদর্শন, বা weltanschauung(জীবনবেদ)-এর লক্ষণযুক্ত। আমার মনে হয় তাঁর কবিতায় কোনো প্রকাশ নেই। এমনকি তাঁর চিঠিগুলোও তাঁর বন্ধুদের হতাশ করে কারণ এগুলো বিদ্বেষময়, বিশেষত কালো, ভারতীয়, পাকিস্তানী এবং অন্যদের প্রতি জাতিবিদ্বেষাত্মক। তিনি ছিলেন অতি হতাশ এবং অতি অসুখী বেপরোয়া একজন মানুষ।  শূন্যতার প্রতি একধরণের আকাঙ্ক্ষার অভিপ্রায় তাঁর ছিল যা ছিল জীবনবিরোধী, যা তাঁকে বেশি কিছু দেয়নি। আমি শঙ্কিত যে, শিল্পে নৈতিক মানদন্ড প্রয়োগের রেওয়াজকে আমরা একেবারেই হারিয়েছি। কারণ যখন কেউ আমাকে বলে যে লারকিন বড়ো কবি, আর তা যদি তখন মানবিক মূল্যবোধকে বাদ দিয়ে ভালো কবিতা লেখার জন্য ঢের হয়ে যায়, তখন আমি সন্দেহবাদী হয়ে উঠি। বোধহয় এ-ই আমার শিক্ষা ও প্রবৃত্তির ভাষ্য। আমার মন্ত্র হলো ইসসার এই হাইকুটির মতো – 

‘নরকের ছাদে আমরা হাঁটি

 পুষ্পের দিকে তাকিয়ে।’ 

শ্লেষে বা ব্যাজোক্তিতে পড়ার জন্য তা অতি খেলো। এই শূন্যতা ও হিংস্রতা, যা লারকিনের weltanschauung(জীবনবেদ)-এর ভিত্তি, তা গ্রহণীয় হবে তার ওপর ভিত্তি করে যদি আপনার কাজ কিছুমাত্রায় আলোমুখী হয়।


প্রশ্ন : আচ্ছা, ভাষা কতটা নিবিড়ভাবে জগৎকে অধিকার করতে পারে?


মিউশ : ভাষা সবকিছুকে অধিকার করতে পারে না, বা তা আবার বিশুদ্ধ খেয়াল-মাফিকও নয়। কিছু নির্দিষ্ট শব্দের, শুদ্ধ প্রথাগত ব্যবহার অপেক্ষা, গভীর অর্থময়তা থাকে। সুতরাং তাকে লেখার জন্য, ভাষা খেয়াল-মাফিক – এ-ধারণাকে আমি বাতিল করি। আমি ভাষার ভেতরে বা তার বিষয়ে লিখতে গিয়ে তাকে écriture-এ নামিয়ে আনতে পারব না।


প্রশ্ন : প্রভিন্সেস কাব্যগ্রন্থের একটি গদ্যকবিতা ‘আ ফিলোসোফারস হোমে’ আপনি ঈশ্বরের প্রতি আরোপ করেছেন ‘একজন ফোটো-সাংবাদিকের আবেগোদ্দীপ্ত উদ্দীপনা।’ এটা কি প্রমাণ হিসেবে ঈশ্বরের আদর্শকে বর্ণনা করে, আর এটা কি সে-আদর্শ যা একজন কবি করতে চায়?


মিউশ : হ্যাঁ। তথাপি আমার বলা উচিত যে, একজন কবি হলেন পনিরের মাঝে এক ইঁদুরের মতো, যে খাওয়ার জন্য কতটুকু পনির আছে এই ভেবে উত্তেজিত। আমি বলেছি যে, হুইটম্যান এমন একজন কবি, আমার ওপর যার খুব শক্তিশালী প্রভাব ছিল। হুইটম্যান সবকিছুকেই কাজে লাগাতে চাইতেন, সবকিছুকেই তাঁর কবিতায় ধরতে চাইতেন, আর আমরা তাঁর অন্তহীন শব্দপ্রবাহকে ক্ষমা করতে পারি, কারণ তিনি যতটা সম্ভব ব্যাপক বাস্তবতাকে কাজে লাগানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। অনুমান করি, এটা কোনো না কোনোভাবে আমার মৃত্যুর পর জীবনের প্রতিচ্ছায়ার সঙ্গে সম্পর্কিত, যা ব্লেকের ভাষায় – ‘অন্তহীন শিকার।’


প্রশ্ন : কবিতা আপনার কাছে ‘বাস্তবের সংরাগময় পশ্চাদ্ধাবন’? আপনি কখনো কি আপনার কাজের মাধ্যমে এ-‘বাস্তব’কে অর্জন করতে পেরেছেন?


মিউশ : বাস্তব যার দ্বারা আমি বুঝিয়েছি ঈশ্বর, তা সবসময় অতলস্পর্শী।


---------------------       সমাপ্ত       ----------------------


[ সংগৃহীত ও সম্পাদিত।

কৃতজ্ঞতা ও ঋণস্বীকার -

১).কুমার চক্রবর্তী।

২). (মতিন বৈরাগী -১৬ই সেপ্টেম্বর ২০১২.)

 arts.bdnews24.com

৩). অংকুর সাহা। ]

 

---------------------------------------------------------------

 #সপ্তম_পর্বের_লিঙ্ক

https://www.facebook.com/groups/sahityapatrika/permalink/1019260678731173/