শরীরে বিদ্যুতের ঝিলিক দিয়ে উঠলো । হঠাত্ করে এক লহমায় আমি বেশ কিছু বছর পিছিয়ে গেলাম । মনে পড়ে গেল অনেক দিন আগের সেই হারিয়ে যাওয়া আমিকে ।
অসমাপ্ত ভালো বাসার কাহিনী
Aditi Chatterjee
সবুজ শস্যখেতের বুক চিরে খুব দ্রুতবেগে কর্কশ কন্ঠে চলেছে রেলগাড়িটি। দূরের পাহাড়ের পিছন থেকে সূর্যাস্ত দেখতে বেশ লাগছিল ।চলেছি সুদূর মধ্যপ্রদেশে এক স্কুলের শিক্ষিকার কাজ নিয়ে ।সকলের বহু বারণ স্বত্বে ও খানিক ক্ষোভ, অভিমান ও জেদের বশে ।
ট্রেনের জানালার ধারের সীটে বসে বাইরের দৃশ্য উপভোগ করার আনন্দই আলাদা ।কত রকমের দৃশ্য দেখা যায় আর দেখা যায় গ্রাম্য মানুষ জনের সাধারণ জীবন যাপন । কত অল্প তেই এরা খুশী থাকে। স্টেশন এল। অনেক ভীড় । বেশ কিছু মানুষের ওঠানামা ব্যস্ত তা। আমার কামড়ায় একটি পরিবার এল। বাবা মা ও বছর 15/16 র একটি মেয়ে । জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে ওরা আমার উল্টো দিকে র সীটে বসল। নেভি ব্লু রঙের স্কার্ট ও হালকা গোলাপি রঙের টপস পরেছে মেয়েটি যা ওর শ্যামলা রঙের সঙ্গে বেশ মানাচ্ছে। মেয়েটির বাহারি চুলের দুটি বিনুনি, ছোট পাতলা ঠোট, টিকালো নাক আর সুন্দর দুটি দীর্ঘ নেত্র দেখে আমার সর্ব
শরীরে বিদ্যুতের ঝিলিক দিয়ে উঠলো । হঠাত্ করে এক লহমায় আমি বেশ কিছু বছর পিছিয়ে গেলাম । মনে পড়ে গেল অনেক দিন আগের সেই হারিয়ে যাওয়া আমিকে ।
দঃ কোলকাতা র এক আভিজাত্য বাড়ির মেয়ে ছিল রিমিওরফে অনুরাধা । বাবা মা ও ছোট ভাইয়ের এই পরিবার টি ছিল সুখী ও ঝামেলা হীন ।রিমি বরাবরই ছিল বেশ শান্ত । নিজের পড়াশোনা, ছবি আঁকা ও বইপড়া এই ছিল তার জীবন ।সেই ছোট্ট জীবনে তার সবথেকে প্রিয় মানুষ টি ছিল তার বাবা। বাবা ছিল যার সব কাজের সঙ্গী। পড়াশোনা, বেড়ানো, খেলাধুলা সবেতেই । মেয়েকে সর্বোত ভাবে বড় করার বিষয়ে বাবার অবদান ছিল অনেক । রিমি তার বাবা কে নিয়ে ছিল খুব গর্বিত । সে নিজের মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল কোন কিছুর বিনিময়ে বাবার মনে দুঃখ না দেওয়ার।
প্রকৃতি র নিয়মে কৈশোর পেরিয়ে সদ্য যৌবনে পদার্পণ করল রিমি। কিন্তু কেরিয়ার সচেতন মেয়েটি তার মন কে দুনিয়ার সব কিছুর থেকে সরিয়ে শুধু কেরিয়ার কেই পাথেয় করে ছিল। তার কাছে প্রেম ছিল এক অপরাধ । আর পুরুষ জাত টির ওপর ছিল তার বিশেষ রাগ। যে সব কর্ম হীন নিষ্কর্মা ছেলেরা নানা অছিলায় তার পিছনে ঘোরাঘুরি করে তারা হল এই পৃথিবীর জঞ্জাল ।
এই হেন রিমি টিউটোরিয়াল থেকে বাড়ী ফেরার পথে লক্ষ্য করল যে কিছু দিন ধরে
একটি ছেলে তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সে খুবই বিরক্ত হয় আর তার বিরক্ত কে আরো বাড়িয়ে দেয় বান্ধবীদের হাসি ঠাট্টা ।
" কাল কে ও যদি দেখি দাঁড়িয়ে থাকতে তাহলে-------"
" তাহলে কি করবি রে দিদি?"
পড়ার টেবিলে বসে নিজের মনে গজগজ করছিল রিমি। কখন যে ভাই এসে হাজির হয়েছে বুঝতে পারে নি।
গম্ভীর হয়ে সে বলে ও সব কিছু না । যা পরতে বোস।
পরদিন যা ভেবেছিল ঠিক তাই হল। ছেলেটিকে দেখে রাগে গা পিত্তি জ্বলে যায় রিমির । সে সোজা ছেলেটির কাছে এগিয়ে গিয়ে বলল ' এখানে দাঁড়িয়ে কি দেখেন, কাল কে ও যদি দেখি না তাহলে দেখবেন কি করব "। রক্তিম আভায় রাঙা ও বড় বড় চোখে তাকিয়ে থাকা রিমি কে দেখে হতচকিত ছেলেটির মুখে কিছু কথা সরে না। সে ধীরে ধীরে চলে যায় । মুখে বিজয়ীর হাসি নিয়ে ফিরে আসে রিমি ।
পরদিন থেকে আর দেখা যায় না ছেলেটির । কিন্তু একি রিমির মন ভালো লাগার বদলে খারাপ লাগছে কেন?ছেলেটির সেই করুণ চোখ দুটি কেন বারবার তাকে তাড়া করে ফেরে? দিন যেন কাটতেই চায় না। এ রকম যে কেন হচ্ছে রিমি কিছু তেই বোঝেনা।
প্রায় ছ দিন পর আবার দেখা মিলল ছেলেটির । রিমির সেদিন টা ছিল সবথেকে খুশী র দিন। "তুমি এতদিন কোথায় ছিলে "?। তুমি ই তো আমাকে দাঁড়াতে বারণ করেছিলে।উত্কণ্ঠিত রিমি কে দেখে
মুচকি হাসে ছেলেটি। লজ্জায় আরক্ত রিমি মুখ থেকে কোন কথা বেরোল না।
শিক্ষিত রিমির দেরি হলে ও বুঝল যে তার জীবনে প্রেমের আগুন ধরেছে । ছেলেটির নাম অমিত ।এরপর থেকে ওরা আর থামে নি। রিমি তার জীবনে একটা অন্য অর্থ খুঁজে পেল। শুষ্ক , রিক্ত মাটী যেমন জলের স্পর্শে হয়ে ওঠে লাবণ্য মন্ডিত তেমনি আনন্দ ও খুশী তে ভরে উঠলো রিমির বৈচিত্র্য হীন , শুষ্ক জীবন ।রিমির সাথে গল্প করতে করতে কখন যেন অমিত হয়ে উঠেছিল রিমির পরিবারের একজন সদস্য ।কিন্তু অপর দিকে সে ধীরে ধীরে এটা ও বুঝেছিল বাবার প্রতি রিমির অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা।আর উপলব্ধি করে ছিল যে ওদের মতো শিক্ষিত সে নয়। কিন্তু রিমি কে ছেড়ে সে থাকবে কি করে!
" আচ্ছা অনুরাধা তোমার মতো এত শিক্ষিত মেয়ে আমাকে ভালো বাসলে কীভাবে?"
" কে জানে কি ভাবে তোমাকে ভালোবেসে ফেললাম । জানো অমিত আমার জীবনের সব দ্বার তুমি খুলে দিয়েছো।আমার জীবন আনন্দের আলো তে ভরে গেছে। আমি বুঝতে পারছি যে কেরিয়ার , পড়াশোনা statas ই সব কিছু নয়, এর বাইরেও একটি জগত আছে আর সেখানে আছো তুমি, my love.
রিমির দিনগুলো স্বপ্নের মতো কাটছিল, কিন্তু বিধি বাম থাকলে স্বপ্ন পুরণ হয় কি করে ।কিছু দিন যাবত্ অমিতের ব্যবহার অন্য রকম লাগছিল রিমির । ঠিক মতো দেখা করতো না। কিছু বলতে গেলে এড়িয়ে যেত।
" তোমার কি হয়েছে অমিত? আমাকে বলবে না" কাতর ভাবে বলে রিমি।
"অনুরাধা তোমার পরিবার আমাদের সম্পর্ক কে মানবে না । "
আমি ঠিক মানিয়ে নেব অমিত । তুমি শুধু আমার পাশে থেকো ।
আর তোমার বাবা যাঁর আশা ভরসা তুমি অনুরাধা । আমাদের সুখের জন্য তিনি হয়তো সব মেনে নেবেন কিন্তু তিনি এ সব করবেন তার ই চ্ছার বিরুদ্ধে । সব ভালো বাসাতে মিল হয় না, অনুরাধা । তোমার সাথে বাবার তো কোন পরিচয় নেই অমিত তবু তোমার তার প্রতি এত শ্রদ্ধা! কাউকে জানতে হলে তার সাথে সামনে থেকে পরিচয় করতে হয় না অনুরাধা । আমি জানি তুমি এক আভিজাত্য বাড়ির মেয়ে । আমার না আছে শিক্ষাগত যোগ্যতা না আছে আভিজাত্য । আমি যে এসব কিছু চাইনা অমিত।
শুধু তোমাকে চাই ।আমি সবাইকে ছেড়ে চলে আসব তোমার কাছে ।
তা হয়না অনুরাধা । ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ হল নিঃস্বার্থপরতা।তোমাকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালো বেসেছি অনুরাধা তাই তোমার জীবন থেকে অনেক দূরে চলে যেতে চাই অনুরাধা । তোমার সাথে এই সময় টুকু ই হবে আমার সম্বল ।সারা জীবন আমি এই স্মৃতি আঁকরে বেঁচে থাকব।
আমি কিছু শুনতে চাই না । কাল আমি সব কিছু ছেড়ে তোমার কাছে চলে আসব। তুমি আসবে কিন্তু অমিত ।
না অমিত ষ আর কোন দিন ফিরল না।মোবাইল এর যুগ ছিল না বলে সব যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে গেল ।
তুমি কি বুঝতে পারলে না অমিত আমি যে তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না । এই যদি তোমার ইচ্ছা ছিল তাহলে কেন এসেছিলে আমার জীবনে। আমি তো ভালোই ছিলাম নিজে কে।
ফিরিয়ে দিয়ে গেল সে আমাকে পরিবারের কাছে ।কিন্তু তা শুধু শারীরিক ভাবে মানসিক দিক থেকে আর কোনদিন কারুর হতে পারলাম না। শুনেছি সে ও এখানের সব কিছু ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে ।
পরবর্তী কালে আরো উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বাবা মা -এর পছন্দমত পাত্র কে বিয়ে করে সংসারী হলাম।
বাবার পছন্দের জামাই যখন অকারণে আমাকে গালি গালাজ করে , বাবার প্রতি অসম্মান জনক কথা বলে তখন আমি মনে মনে হাসি আর ভাবি,হায়রে অদৃষ্ট, এই হল শিক্ষা। ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত আদরের জামাই বাবা কে কত সম্মান দিচ্ছে আর অশিক্ষিত অমিত বাবার জন্য তার জীবনের সব কিছু ছেড়ে দিল।
আজ তাই সকলের কাছ থেকে নিজেকে মুক্ত করার পালা। সকলের প্রতি কর্তব্য করতে করতে আমি শারীরিক ও মানসিক ভাবে ক্লান্ত ।তাই এবার নিজের মতো করে বাঁচার জন্য বেড়িয়ে পড়লাম সংসার ছেড়ে ।
আচমকা ট্রেনের আওয়াজ এ সংবিত ফিরে পেলাম । অন্ধকারের বুক চিরে আর্ত নাদ করতে করতে ছুটে চলল ট্রেন ।
তার জীবন নের আদর্শ ছিল তার বাবা ।
Post a Comment